মজন্তালী সরকার

উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী

এক গ্রামে দুটো বিড়াল ছিল। তার একটা থাকত গোয়ালাদের বাড়িতে, সে খেত দই, দুধ, ছানা, মাখন আর সর। আর একটা থাকত জেলেদের বাড়িতে, সে খেত খালি ঠেঙার বাড়ি আর লাথি। গোয়ালাদের বিড়ালটা খুব মোটা ছিল, আর সে বুক ফুলিয়ে চলত। জেলেদের বিড়ালটার গায় খালি চামড়া আর হাড় কখানি ছিল। সে চলতে গেলে টলত আর ভাবত, কেমন করে গোয়ালাদের বিড়ালের মতো মোটা হব।
শেষে একদিন সে গোয়ালাদের বিড়ালকে বললে, ‘ভাই, আজ আমার বাড়িতে তোমার নিমন্ত্রণ।’

সব কিছু মিছে কথা। নিজেই খেতে পায় না, সে আবার নিমন্ত্রণ খাওয়াবে কোথা থেকে? সে ভেবেছে, ‘গোয়ালাদের বিড়াল আমাদের বাড়ি এলেই আমার মতন ঠেঙা খাবে আর মরে যাবে, তারপর আমি গোয়ালাদের বাড়িতে গিয়ে থাকব।’
যে কথা সেই কাজ। গোয়ালদের বিড়াল জেলেদের বাড়িতে আসতেই জেলেরা বললে, ‘ঐ রে। গোয়ালাদের সেই দই-দুধ-খেকো চোর বিড়ালটা এসেছে, আমাদের মাছ খেয়ে শেশ করবে। মার বেটাকে!’
বলে তারা তাকে এমনি ঠেঙালে যে, বেচারা তাতে মরেই গেল। রোগা বিড়াল তো জানতই যে, এমনি হবে। সে তার আগেই গোয়ালাদের বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হয়েছে। সেখানে খুব করে ক্ষীর-সর খেয়ে, দেখতে-দেখতে সে মোটা হয়ে গেল। তখন আর সে অন্য বিড়ালদের সঙ্গে কথা কয় না, আর নাম জিগগেস করলে বলে, ‘মজন্তালী সরকার।’

একদিন মজন্তালী সরকার কাগজ কলম নিয়ে বেড়াতে বেরুল। বেড়াতে-বেড়াতে সে বনের ভিতরে গিয়ে দেখল যে তিনটি বাঘের ছানা খেলা করছে। সে তাদের তিন তাড়া লাগিয়ে বলল, ‘এইয়ো! খাজনা দে!’ বাঘের ছানাগুলো তার কাগজ কলম দেখে আর ধমক খেয়ে বড্ড ভয় পেল। তাই তারা তাড়াতাড়ি তাদের মায়ের কাছে গিয়ে বললে, ‘ও মা, শিগগির এস! দেখ এটা কি এসেছে, আর কী বলছে!’, বাঘিনী তাদের কথা শুনে এসে বললে, ‘তুমি কে বাছা? কোথেকে এলে? কী চাও?’ মজস্তালী বললে, ‘আমি রাজার বাড়ির সরকার, আমার নাম মজন্তালী। তোরা যে আমাদের রাজার জায়গায় থাকিস, তার খাজনা কই? খাজনা দে।’
বাঘিনী বললে, ‘খাজনা কাকে বলে তা তো আমি জানিনে। আমরা খালি বনে থাকি, আর কেউ এলে তাকে ধরে খাই। তুমি না হয় একটু বস, বাঘ আসুক।’
তখন মজন্তালী একটা উঁচু গাছের তলায় বসে, চারিদিকে উঁকি মেরে দেখতে লাগল। খানিক বাদেই সে দেখল ঐ বাঘ আসছে। তখন সে তাড়াতাড়ি কাগজ কলম রেখে, একেবারে গাছের আগায় গিয়ে উঠল।

বাঘ আসতেই তো তা বাঘিনী তার কাছে সব কথা বলে দিয়েছে, আর বাঘের যে কি রাগ হয়েছে কি বলব! সে ভয়ানক গর্জন করে বললে, ‘কোথায় সে হতভাগা? এখুনি তার ঘাড় ভাঙছি!’
মজন্তালী গাছের আগা থেকে বললে, ‘কী রে বাঘা, খাজনা দিবি না? আয়, আয়!’
শুনেই তো বাঘ দাঁত মুখ খিঁচিয়ে ‘হালুম!’ বলে দুই লাফে সেই গাছে গিয়ে উঠেছে। কিন্তু খালি উঠলে কি হয়? মজন্তালীকে ধরতে পারলে তো! সে একটুখানি হালকা জন্তু, সেই কোন্ সরু ডালে উঠে বসেছে, অত বড় ভারি বাঘ সেখানে যেতেই পারছে না। না পেরে রেগে-মেগে বেটা দিয়েছে এক লাফ, অমনি পা হড়কে গিয়েছে পড়ে। পড়তে গিয়ে, দুই ডালের মাঝখানে মাথা আটকে, তার ঘাড় ভেঙে প্রাণ বেরিয়ে গিয়েছে।
তা দেখে মজন্তালী ছুটে এসে তার নাকে তিন চারটে আঁচড় দিয়ে, বাঘিনীকে ডেকে বললে, ‘এই দেখ, কী করেছি। আমার সামনে বেয়াদবি।’
এ সব দেখে শুনে তো ভয়ে বাঘিনী বেচারীর প্রাণ উড়ে গেল। সে হাত জোড় করে বললে, ‘দোহাই মজন্তালী মশাই আমাদের প্রাণে মারবেন না। আমরা আপনার চাকর হয়ে থাকব।’
তাতে মজন্তালী বললে, ‘আচ্ছা তবে থাক, ভালো করে কাজকর্ম করিস, আর আমাকে খুব ভালো খেতে দিস।’
সেই থেকে মজন্তালী বাঘিনীদের বাড়িতেই থাকে। খুব করে খায় আর বাঘিনীর ছানাগুলির ঘাড়ে চড়ে বেড়ায়। সে বেচারারা তার ভয়ে একেবারে জড়-সড় হয়ে থাকে, আর তাকে মনে করে, না জানি কত বড় লোক।

একদিন বাঘিনী তাকে হাত জোড় করে বললে, ‘মজন্তালী মশাই, এ বনে খালি ছোট-ছোট জানোয়ার, এতে কিছু আপনার পেট ভরে না। নদীর ওপারে খুব ভারি বন আছে, তাতে খুব বড়-বড় জানোয়ারও থাকে। চলুন সেইখানেই।’
শুনে মজন্তালী বললে, ‘ঠিক কথা। চল ওপারে যাই।’ তখন বাঘিনী তার ছানাদের নিয়ে, দেখতে-দেখতে নদীর ওপারে চলে গেল। কিন্তু মজন্তালী কই? বাঘিনী আর তার ছানারা অনেক খুঁজে দেখল— ঐ মজন্তালী সরকার নদীর মাঝখানে পড়ে হাবু-ডুবু খাচ্ছে। স্রোতে তাকে ভাসিয়ে সেই কোথায় নিয়ে গিয়েছে, আর ঢেউয়ের তাড়ায় তার প্রাণ যায়-যায় হয়েছে।
মজন্তালী তো ঠিক বুঝতে পেরেছে যে, আর দুটো ঢেউ এলেই সে মারা যাবে। এমন সময় ভাগ্যিস বাঘিনীর একটা ছানা তাকে তাড়াতাড়ি ডাঙায় তুলে এনে বাঁচাল, নইলে সে মরেই যেত, তাতে আর ভুল কি?
কিন্তু মজন্তালী সরকার তাদের সে কথা জানতেই দিল না। সে ডাঙায় উঠে ভয়ানক চোখ রাঙিয়ে বাঘের ছানাকে চড় মারতে গেল, আর গাল যে দিল তার তো লেখাজোখাই নেই। শেষে বললে, ‘হতভাগা মূর্খ, দেখ দেখি কী করলি! আমি অমন চমৎকার হিসাবটা করছিলুম, সেটা শেষ না হতেই তুই আমাকে টেনে তুলে আনলি— আর আমার সব হিসাব এলিয়ে গেল! আমি সবে গুণছিলুম, নদীতে কটা ঢেউ, কতগুলো মাছ আর কতখানি জল আছে। মূর্খ বেটা, তুই এর মধ্যে গিয়ে সব গোলমাল করে দিলি। এখন যদি আমি রাজামশাইয়ের কাছে গিয়ে এর হিসাব দিতে না পারি, তবে মজাটা টের পাবি।’

এসব কথা শুনে বাঘিনী তাড়াতাড়ি এসে হাত জোড় করে বললে, ‘মজন্তালী মশাই, ঘাট হয়েছে, এবারে মাপ করুন। ওটা মূর্খ, লেখাপড়া জানে না তাই কি করতে কী করে ফেলেছে!’
মজন্তালী বললে, ‘আচ্ছা, এবারে মাপ করলুম। খবরদার। আর যেন কখনো এমন হয় না।’ এই বলে মজন্তালী তার ভিজে গা শুকাবার জন্যে রোদ খুঁজতে লাগল।
ভারি বনের ভিতরে সহজে রোদ ঢুকতে পায় না। সেখানে রোদ খুঁজতে গেলে উঁচু গাছের আগায় গিয়ে উঠতে হয়। মজন্তালী একটা গাছের আগায় উঠে দেখলে যে, এই বড় এক মরা মহিষ মাঠের মাঝখানে পড়ে আছে। তখন সে তাড়াতাড়ি গিয়ে সেই মহিষটার গায়ে কয়েকটা আঁচড় কামড় দিয়ে এসে বাঘিনীকে বললে, ‘শিগগির যা, আমি একটা মোষ মেরে রেখে এসেছি।’
বাঘিনী আর তার ছানাগুলো ছুটে গিয়ে দেখলো, সত্যি মস্ত এক মোষ পড়ে আছে। তারা চারজনে মিলে অনেক কষ্টে সেটাকে টেনে আনলে, আর ভাবলে, ‘ঈস! মজন্তালী মশায়ের গায়ে কি ভয়ানক জোর!’
আর একদিন মজন্তালীকে বললে, ‘মজন্তালী মশাই, এ বনে বড়-বড় হাতি আর গণ্ডার আছে। চলুন একদিন সেইগুলো মারতে যাই।’
একথা শুনে মজন্তালী বললে, ‘তাই তো হাতি গণ্ডার মারব না তো মারব কি? চল আজই যাই।’
বলে সে তখুনি সকলকে নিয়ে হাতি আর গণ্ডার মারতে চলল। যেতে-যেতে বাঘিনী তাকে জিগগেস করলে, ‘মজন্তালী মশাই, আপনি খাপে থাকবেন না, ঝাঁপে থাকবেন?’ খাপে থাকবার মানে কি? না-জন্তু এলে তাকে ধরে মারবার জন্যে চুপ করে গুড়ি মেরে বসে থাকা। আর ঝাঁপে থাকার মানে হচ্ছে, বনের ভিতরে গিয়ে ঝাঁপাঝাঁপি করে জন্তু তাড়িয়ে আনা। মজন্তালী ভাবলে, ‘আমার তাড়ায় আর কোন জন্তু ভয় পাবে?’ তাই সে বললে,
‘আমি ঝাঁপিয়ে যে সব জন্তু পাঠাব, তা কি তোরা মারতে পারিস? তোরা ঝাঁপে যা, আমি খাপে থাকি।’
বাঘিনী বললে, ‘তাই তো, সে সব ভয়ানক জন্তু কি আমরা মারতে পারব? চল বাছারা, আমরা ঝাঁপে যাই।’
এই বলে বাঘিনী তার ছানাগুলোকে নিয়ে বনের অন্য ধারে গিয়ে, ভয়ানক ‘হালুম-হালুম’ করে জানোয়ারদের তাড়াতে লাগল। মজন্তালী জানোয়ারদের ডাক শুনে, একটা গাছের তলায় বসে ভয়ে কাঁপতে লাগল।

খানিক বাদে একটা সজারু সড়-সড় করে সেই দিক পানে ছুটে এসেছে, আর মজন্তালী তাকে দেখে ‘মাগো’ বলে সেই গাছের একটা শিকড়ের তলায় গিয়ে লুকিয়েছে, এমন সময় একটা হাতি সেইখানে দিয়ে চলে গেল। সেই হাতির একটা পায়ের এক পাশ সেই শিকড়ের উপরে পড়েছিল, তাতেই মজন্তালীর পেট ফেটে গিয়ে, বেচারার প্রাণ যায় আর কি।
অনেকক্ষণ ঝাঁপাঝাঁপি করে বাঘেরা ভাবলে, ‘মজন্তালী মশাই না জানি এতক্ষণে কত জন্তু মেরেছেন, চল একবার দেখে আসি।’ তারা এসে মজন্তালীর দশা দেখে বললে, ‘হায়-হায়! মজন্তালী মশায়ের এ কি হল?’
মজন্তালী বললে, ‘আর কি হবে? তোরা যে সব ছোট-ছোট জানোয়ার পাঠিয়েছিলি। দেখে হাসতে-হাসতে আমার পেটই ফেটে গিয়েছে।’ এই বলে মজন্তালী মরে গেল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *